খাড়েরা গ্রাম

আগস্ট ৫, ২০২৬

ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, মানবতা ও সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য জনপদ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জনপদ খাড়েরা শুধু একটি গ্রামের নাম নয়, এটি ইতিহাস, শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, মানবিকতা ও সামাজিক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল প্রতীক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই জনপদ আপন ঐতিহ্যকে ধারণ করে আজও আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল।

নামকরণের ইতিহাস

লোকমুখে প্রচলিত আছে, ‘খেয়া’ অর্থ নৌকা। কয়েকশ বছর আগে আখাউড়ার দেবগ্রাম থেকে হাতনির বিল হয়ে খেওড়া অতিক্রম করে তৎকালীন প্রমত্তা বুড়ি নদী দিয়ে নিয়মিত নৌযান চলাচল করত। তখন বুড়ি নদী ছিল প্রাণবন্ত জলপথ। ১৬৬০ সালের ড্যানব্রুকের মানচিত্রেও নবীনগরের দক্ষিণে বিশাল জলপ্রবাহকে ব্রহ্মপুত্র নামে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই নৌপথ ও খেয়াঘাটকে কেন্দ্র করেই ধীরে ধীরে খাড়েরা ও খেওড়া নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

লোককথা, বিশ্বাস ও এক ঐতিহাসিক সদকার প্রথা

১৯৫৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় গ্রামের তিন প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি বিশাল তেঁতুল ও ঘাব গাছ ভেঙে পড়ে। গ্রামবাসী গাছগুলো কেটে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই নানা অস্বাভাবিক ঘটনার কথা প্রচলিত হতে থাকে। বিশেষ করে শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা গ্রামবাসীকে আতঙ্কিত করে তোলে।

সমাধানের আশায় খাড়েরা জামে মসজিদের তৎকালীন ইমাম হাফেজ ইয়াকুব আলীর পরামর্শে গ্রামবাসী চাঁদপুরের ফরাজীকান্দির পীরে কামেল হযরত মোহাম্মদ বোরহান উদ্দীন (রহ.)-এর শরণাপন্ন হন। তাঁর নির্দেশে প্রতি বছর পবিত্র রমজানের ২৭ তারিখে গরু জবাই করে এতিম ও দরিদ্র মানুষের মাঝে সদকা হিসেবে বিতরণ শুরু হয়। সেই ঐতিহ্য আজও অব্যাহত রয়েছে। এদিন গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে দোয়া করেন এবং অতীতের সেই ঘটনাগুলো স্মরণ করেন। এটি এখন খাড়েরার এক অনন্য ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

শিক্ষার আলো ছড়ানো প্রতিষ্ঠানসমূহ:

খাড়েরা মোহাম্মদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়

১৯২৯ সালে শিক্ষানুরাগী সমাজসেবক হাজী আবদুল ওয়ালি মাস্টার তাঁর নিজস্ব প্রায় ৩০ শতক জমির ওপর বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। পীরে কামেল আলহাজ মাওলানা আবদুল খালেক (রহ.), ছতুরা শরীফ বিদ্যালয়ের নামকরণ ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে অধ্যাপক খোরশেদ আলম ভূঁইয়ার উদ্যোগে ১৯৫৪ সালে এটি উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টি এ অঞ্চলের শিক্ষার অন্যতম আলোকবর্তিকা।

খাড়েরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয় প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রাথমিক শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে চলেছে।

খাড়েরা বড়িয়াবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

১৯৯৫ সালে মরহুম ডা. শামছুল হকের সহধর্মিণী সুরাইয়া বেগমের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি এলাকার শিক্ষাবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টস একাডেমি (বি.এস. একাডেমি)

১ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে মোস্তাফা মাহমুদ সারোয়ার, মোহাম্মদ হামজা মাহমুদ, শাহজাহান ভূঁইয়া, আবুল হাসনাত ও সাঈদা কামালের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে এটি সুপরিচিত।

এম. এ. তাহের প্রি-ক্যাডেট স্কুল

২০১৩ সালে তাজুল ইসলামের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি কোমলমতি শিশুদের আধুনিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে।

ধর্মীয় ও মানবিক প্রতিষ্ঠান:

খাড়েরা জামে মসজিদ

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে এমদাদ আলী মুন্সির জমিদান ও উদ্যোগে টিনের ঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় এটি বৃহৎ পাকা মসজিদে রূপ নেয়। বর্তমানে প্রায় ছয় বিঘা জমির ওপর নির্মিত দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদ গ্রামের ধর্মীয় জীবনের প্রাণকেন্দ্র। মরহুম রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার নেতৃত্বে মসজিদের ব্যাপক সংস্কার সম্পন্ন হয়। তাঁর মৃত্যুর পর শিল্পপতি আনিছুর রহমান ভূঁইয়া দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রতি জুমার দিনে পুরো গ্রামের মানুষ একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন, যা আজও বিরল সামাজিক ঐক্যের দৃষ্টান্ত।

খাড়েরা ডি ঈদগাহ:

উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের সামাজিক ঐক্য ও সম্প্রীতি রক্ষার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় খাড়েরা ডি সংঘ। সেই সূত্রেই প্রতিষ্ঠা পায় ঐতিহাসিক খাড়েরা ডি ঈদগাহ। প্রায় ছয় বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই ঈদগাহে বহু গ্রামের মানুষ একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করেন। সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন মো, নুরুল ইসলাম ভূঁইয়া। সময়ের পরিবর্তনে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও খাড়েরা ডি আজও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক।

খাড়েরা ফাতেহিয়া এতিমখানা ও খানকা

১৯৭৪ সালে পীরে কামেল শাহসফি ফতেহ আলী মাস্টার (রহ.) প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে এর নাম ছিল খালিকিয়া ফাতেহিয়া এতিমখানা। দীর্ঘদিন ধরে এটি এতিম শিশুদের আশ্রয় ও শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

খাড়েরা আল-আমিন বাড়িয়া কমপ্লেক্স

সূফি আলহাজ আনিছুর রহমান ভূঁইয়ার প্রতিষ্ঠিত এই কমপ্লেক্সের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে আল-আমিন দরবার শরীফ, মিজানুর ইসলাম ভূঁইয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, রহিমা খাতুন এতিমখানা, গণকবর, ইসলামিয়া পাঠাগার, ফোরকানিয়া মাদ্রাসা ও আনন্দ স্কুল। অধিকাংশ কার্যক্রমই তাঁর নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হয়।

জামিয়া মুফতি ফজলুল হক (রহ.) মাদ্রাসা:

প্রিন্সিপাল ফজলুল হক কমপ্লেক্স, খাড়েরা, কসবা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
প্রতিষ্ঠাতা:
প্রভাষক পীরজাদা মাওলানা মোহাম্মদ মোদ্দাচ্ছির আল-ক্বাদেরী সাহেব।
প্রতিষ্ঠাকাল:২০২৩ খ্রিস্টাব্দ। শিক্ষা কার্যক্রম বর্তমানে মাদ্রাসাটিতে সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে: হিফজ বিভাগ কিতাব বিভাগ আলিয়া নেসাব
কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক আদর্শ শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে প্রতিষ্ঠানটি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

সমাজসেবা ও সাংস্কৃতিক সংগঠন

ডা. শামছুল হক-সুরাইয়া বেগম মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন ও পাঠাগার

২০০১ সালে মো. ফজলুল হক টিপুর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, ওষুধ বিতরণ, শীতবস্ত্র প্রদান এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করে আসছে। এর পাঠাগারে প্রায় ১৪ হাজার বই সংরক্ষিত রয়েছে।

সবুজ সংঘ

একটি মানবিক সংগঠন। সভাপতি সাংবাদিক লোকমান হোসেন পলা এবং সাধারণ সম্পাদক মো. আবু হামজা। শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, বৃত্তি প্রদান ও মানবিক সহায়তামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে।

প্রতিভা সাহিত্য সংঠন

১৯৯৫ সালে সাংবাদিক ও কবি লোকমান হোসেন পলা প্রতিষ্ঠা করেন। নবীন লেখকদের উৎসাহ প্রদান, বইমেলা আয়োজন, রক্তদান, বইবেরা, রক্তের গ্রুপ নির্ণয় এবং মাদকবিরোধী প্রচারণায় সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

খাড়েরা শিক্ষা কল্যাণ ফাউন্ডেশন

১৯৯৪ সালে আলহাজ মো. সেলিম মাস্টারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষাবিস্তারে সংগঠনটির অবদান আজও স্মরণীয়।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা

খাড়েরা বাজার, বাজার জামে মসজিদ, খাড়েরা বাসস্টেশন, প্রায় ১০টি ফোরকানিয়া মাদ্রাসা, ১২টি কবরস্থান, পল্লী বিদ্যুৎ অফিস, ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়সহ নানা প্রতিষ্ঠান গ্রামটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

খাড়েরা কেবল একটি গ্রাম নয়, এটি ইতিহাসের স্মৃতি, শিক্ষার আলো, ধর্মীয় মূল্যবোধ, মানবতার চর্চা এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক জীবন্ত দলিল। শত বছরের ঐতিহ্য, মানুষের আত্মত্যাগ, সমাজসেবার অনন্য দৃষ্টান্ত এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব। খাড়েরার অতীত যেমন গৌরবময়, তেমনি এর ভবিষ্যৎও হোক আরও সমৃদ্ধ, আলোকিত ও মানবকল্যাণমুখী।
( তথ্য সংগ্রহ লেখা,লোকমান হোসেন পলা)
সাধারণ সম্পাদক
কসবা প্রেস ক্লাব।